Paharpur Buddhist Monastery

আংকর ওয়াটের আদি রূপ কি এই পাহাড়পুর? তিব্বতের ‘দ্বিতীয় বুদ্ধ’ কি বাঙালি?

M R Jannat Swapon
M R Jannat Swapon
Journalist & Content Creator
- Journalist & Content Creator
9 Min Read

আপনি কি জানেন, হাজার বছর আগে এই স্থাপনাটিই ছিল দক্ষিণ এশিয়ার জ্ঞানচর্চার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ? অনেকের মতে, বিশ্ববিখ্যাত বৃহত্তম ধর্মীয় স্থাপনা আংকর ওয়াটের স্থাপত্যশৈলীর মূল অনুপ্রেরণাও লুকিয়ে আছে আমাদের এই পাহাড়পুরেই!

প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, পাহাড়পুরের ‘ক্রুশাকার’ নকশা এবং এর ধাপযুক্ত পিরামিড সদৃশ কাঠামো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মন্দির স্থাপত্যে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বিশেষ করে আংকর ওয়াটের আগের দিকের অনেক মন্দিরের নকশা পাহাড়পুরের আদলে তৈরি বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন।

একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো… আমরা এখন এক হাজার বছর আগের কোনো এক ভোরে দাঁড়িয়ে আছি। চারপাশে কোনো আধুনিক কোলাহল নেই। কানে ভেসে আসছে হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষুর সমবেত মন্ত্রোচ্চারণ। বাতাসের সাথে মিশে আছে ধূপ আর চন্দনের সুবাস।

আপনি যে জায়গায় এখন ধ্বংসস্তূপ দেখছেন, সেখানে তখন আকাশছোঁয়া এক বিশাল মন্দির। যার দেয়ালগুলো রোদে চিকচিক করছে নিখুঁত কারুকাজে। এখানে কোনো দেশি-বিদেশি সীমানা নেই; আছে শুধু বিশুদ্ধ জ্ঞানের সাধনা।

আজ থেকে বারোশ বছর আগে এই জায়গাটা যখন কোনো ধ্বংসাবশেষ ছিল না, তখন এর সোনালী চূড়া বহুদূর থেকে দেখা যেত। চারদিকের ১৭৭টি কক্ষ থেকে পাণ্ডুলিপির খসখস শব্দ ভেসে আসত। এটি কেবল একটি স্থাপনা ছিল না, এটি ছিল তৎকালীন পৃথিবীর ‘নলেজ ক্যাপিটাল’।

প্রায় ২৭ একর জমির উপর বিস্তৃত এই বিশাল বৌদ্ধ বিহারটি পালবংশের দ্বিতীয় রাজা শ্রী ধর্মপালদেব অষ্টম শতকের শেষের দিকে বৌদ্ধ ধর্মীয় শিক্ষা, গবেষণা এবং জ্ঞানচর্চার প্রসারের উদ্দেশ্যে নির্মাণ করেছিলেন।

প্রায় ৩০০ বছর ধরে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ধর্মচর্চা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে সমৃদ্ধ ছিল এটি। এখানে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা তাঁদের জ্ঞানচর্চা ও ধ্যান করতেন।

বিহারের কেন্দ্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল স্তূপ। যা এর স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এর দেয়ালগুলোতে পোড়ামাটির চিত্রফলকে তৎকালীন সমাজের নানা দিক জীবন্ত হয়ে উঠেছে। যা এখানে আসা পর্যটকদের আজও মুগ্ধ করে।

বিহারের কেন্দ্রীয় মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী সত্যিই অসাধারণ। এর দেয়ালে খোদাই করা টেরাকোটার চিত্রফলকগুলোতে তৎকালীন জীবনযাত্রার জীবন্ত ছবি পাওয়া যায়। এই বিহারের জ্যামিতিক নকশা নিঃসন্দেহে পৃথিবীর অন্যতম সেরা স্থাপত্য কীর্তি। এই বিহারের ধ্বংসাবশেষ আজও আমাদের অতীতের গৌরবময় দিনগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

আমি এম আর জান্নাত স্বপন। আজ আপনাদের নিয়ে এসেছি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে ২৫৬ কি.মি. দূরে… “নওগাঁর বদলগাছীর সেই সোমপুর মহাবিহারে। আজ আমরা শুধু ইট-পাথর দেখবো না, আমরা অনুভব করবো প্রাচীন বাংলার সেই অবিশ্বাস্য বুদ্ধিমত্তাকে।

কিন্তু এই বিশাল স্থাপত্য কীর্তি একসময় মাটির নিচে হারিয়ে গেল কীভাবে? মূলত পাল সাম্রাজ্যের পতন এবং প্রতিকূল জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই বিহারটি জনশূন্য ও পরিত্যক্ত হতে শুরু করে। তবে এর ধ্বংসের প্রক্রিয়াটি ছিল দীর্ঘস্থায়ী।

শুধু দ্বাদশ শতকের শেষে মুসলিম শাসনের সূচনা ও বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রতিষ্ঠাতা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির বাংলা আক্রমণই নয়, তারও আগে একাদশ শতকে ‘বঙ্গাল সৈন্যদলের’ অগ্নিসংযোগ বিহারটির ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছিল—যার প্রমাণ পাওয়া যায় বিপ্রদাস পন্তের নালন্দা শিলালিপি থেকে। এটি ১১শ শতকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

বঙ্গাল সৈন্যদলের দেওয়া আগুনে এই বিহারের একটি বড় অংশ পুড়ে যায়। এই অগ্নিকাণ্ডে বিহারের কেন্দ্রীয় মন্দিরের অনেক সৌন্দর্য নষ্ট হয় এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এখান থেকে সরে যেতে বাধ্য হন।

পাল সম্রাটদের পর সেন রাজবংশের শাসনামলে বৌদ্ধধর্মের পরিবর্তে হিন্দুধর্ম রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ায় এই মহাবিহারটি তার জৌলুস হারায়। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং পরবর্তী কয়েকশ বছর ধরে পলি জমে এটি একটি মাটির ঢিবিতে পরিণত হয়, যা স্থানীয়দের কাছে ‘পাহাড়’ নামে পরিচিতি পায়।

সোমপুর মহাবিহারের এই হারানো গৌরব প্রথম বিশ্ববাসীর নজরে আসে ১৮৭৯ সালে, প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক স্যার আলেকজান্ডার কানিংহামের পরিদর্শনের মাধ্যমে। তবে পাহাড়ের মতো বিশাল ও দুর্ভেদ্য এই ঢিবি খনন করা তখন ছিল এক দুঃসাধ্য চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর, ১৯২৩ সালে এখানে আনুষ্ঠানিকভাবে খনন কাজ শুরু হয়।

এই মহাযজ্ঞের অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন প্রখ্যাত ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক ও ‘আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’ -এর তৎকালীন মহাপরিচালক কে. এন. দীক্ষিত। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় পাহাড়পুরের মাটি খুঁড়ে বের করে আনা হয় বাংলার প্রাচীন ও অনন্য এই স্থাপত্যশৈলী।

সঙ্গত কারণে, কে. এন. দীক্ষিত কেবল সোমপুর বিহারই নয়, বরং সিন্ধু সভ্যতার মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা গবেষণাতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন।

খনন কার্যের ফলে বিস্ময় জাগিয়ে উন্মোচিত হয় অবিভক্ত ভারতবর্ষের সর্ববৃহৎ এই বৌদ্ধ বিহারের কাঠামো।

অনন্য স্থাপত্যশৈলী ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো সোমপুর মহাবিহারকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান’ হিসেবে ঘোষণা করে। বর্তমানে বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্যের মধ্যে এটিই প্রথম স্বীকৃত স্থান।

আজ এই প্রাচীন নিদর্শন আমাদের গর্বের সাথে মনে করিয়ে দেয় যে—স্থাপত্য, শিল্প এবং জ্ঞানচর্চায় আমরা এক সময় বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছি।

এই গল্পের মূল নায়ক একজন বাঙালি। অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। তিনি  বিক্রমশীলা বিহারের প্রধান বা আচার্য হিসেবে বেশি পরিচিত। সোমপুর বিহারে সেই সোনালী সময়ে  তিনি এখানে অধ্যাপনা ও অনুবাদ কাজ করেছিলেন।

অনেকেই প্রশ্ন করেন, অতীশ দীপঙ্কর যে এখানেই ছিলেন তার প্রমাণ কী? ইতিহাস বলছে, তিব্বতি ভাষায় অনূদিত তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘মাধ্যমক রত্নপ্রদীপ’-এ এই সোমপুর মহাবিহারের স্পষ্ট উল্লেখ আছে। সেখানে তিনি নিজের বংশপরিচয় এবং এই বিহারের ভিক্ষু সংঘের কথা লিখে গেছেন।

পাহাড়পুরে খননকাজের সময় পাওয়া সিলমোহর আর শিলালিপিগুলোও সেই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে। তিব্বতের বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার গল্প ছড়িয়ে আছে—কীভাবে তিনি মন্ত্রের শক্তিতে বন্যা থামিয়েছিলেন বা পাহাড়ের কঠিন বাধা ডিঙিয়েছিলেন। এসব গল্প আসলে তাঁর অসীম সাহস আর গভীর প্রজ্ঞারই প্রতিফলন।

কেন ওনাকে নিয়ে আজও সারা পৃথিবী মেতে আছে? কারণ ওনার একটি সাহসী সিদ্ধান্ত।

দশম শতাব্দীতে যখন কোনো আধুনিক বাহন ছিল না, রাস্তা ছিল না—তখন ১০৪২ সালে যখন তিনি তিব্বতে পৌঁছান, তখন তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৫৯-৬০ বছর। এই মানুষটি হিমালয়ের দুর্গম বরফ মাড়িয়ে পায়ে হেঁটে তিব্বতে গিয়েছিলেন। কেন? কারণ তিব্বতের রাজা তাকে কাতর অনুরোধ জানিয়েছিলেন তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্ম সংস্কারের জন্য।

তিব্বতিরা বিশ্বাস করে, অতীশ দীপঙ্কর ছাড়া তাদের অস্তিত্ব আজ থাকতো না। আজও তিব্বতের প্রতিটি মঠে আমাদের এই বাংলার সন্তানকে ‘দ্বিতীয় বুদ্ধ’ হিসেবে পরম শ্রদ্ধায় পূজা করা হয়। তিব্বতিদের কাছে তিনি ‘জোবো-জে’ বা দ্বিতীয় বুদ্ধ হিসেবে সমাদৃত। তিব্বতি ইতিহাস অনুযায়ী, তিনি বাংলাদেশের বিক্রমপুর (বজ্রযোগিনী) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

এবার এই স্থাপত্যের দিকে তাকান। জানলে অবাক হবেন, কম্বোডিয়ার বিখ্যাত আংকর ওয়াট কিংবা ইন্দোনেশিয়ার জাভার বোরোবুদুর, মিয়ানমারের পাগানের আনন্দ মন্দির,  ভারতের বিক্রমশীলা মহাবিহাররের মতো বিশ্বখ্যাত স্থাপনাগুলোর নকশা কিন্তু এই পাহাড়পুর থেকেই অনুপ্রাণিত। এসব স্থাপত্যে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে সোমপুর বিহার।  যা পরবর্তীকালে আংকর ওয়াটের মতো বিশাল স্থাপনা তৈরিতে স্থপতিদের অনুপ্রাণিত করেছিল। আংকর ওয়াটের ক্ষেত্রে পাহাড়পুরের স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব পরোক্ষ বলে মনে করা হয়। তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মন্দির স্থাপত্যে পাহাড়পুরের প্রভাব অনস্বীকার্য।  পাহাড়পুর বিহারটি ছিল তৎকালীন দক্ষিণ হিমালয়ের বৃহত্তম জ্ঞানপীঠ। আয়তনে এটি ভারতের বিখ্যাত নালন্দা বিহারের  সাথে পাল্লা দেওয়ার মতো।

দেয়ালগুলোর দিকে একবার দেখুন। এই যে পোড়ামাটির চিত্রফলক—এগুলোই হচ্ছে তৎকালীন বাংলার জীবন্ত দলিল। এখানে শুধু ধর্ম নেই, এখানে আছে সাধারণ মানুষের জীবন। কেউ বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে, কেউ শিকার করছে, কেউবা প্রেমে মগ্ন।

বাঘ, হাতি থেকে শুরু করে রূপকথার কাল্পনিক প্রাণী—সবই যেন এই ইটের গায়ে বন্দি হয়ে আছে। হাজার বছর আগের বাঙালির রুচি আর শিল্পবোধ কতটা উন্নত ছিল, এই দেয়ালগুলো তার সাক্ষী।

সাংবাদিক হিসেবে আমি অনেক জায়গায় গিয়েছি, কিন্তু পাহাড়পুর আমাকে প্রতিবার নতুন করে ভাবায়। আমরা প্রায়ই বলি আমাদের দেশটা ছোট। কিন্তু একবার ভাবুন তো, এক হাজার বছর আগে আমরাই ছিলাম পুরো এশিয়া মহাদেশের শিক্ষাগুরু!

আমাদের মাটি থেকে উঠে আসা একজন মানুষ তিব্বত জয় করছেন, আর আমাদের স্থাপত্য দেখে বিশ্ব জয় করছে অন্য দেশগুলো। এই গর্ব কি আমরা আজ ধরে রাখতে পেরেছি?

আজ পাহাড়পুর ধ্বংসাবশেষ। নোনা ধরে দেয়ালগুলো ক্ষয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এর প্রতিটি ধূলিকণা আমাদের প্রশ্ন করে—আমরা কি আমাদের এই শেকড়কে চিনি?

সময় বদলেছে। আজ আর সেই তিব্বতি পাণ্ডুলিপির খসখস শব্দ নেই। কিন্তু অতীশ দীপঙ্করের সেই জ্ঞানের আলো আজও নিভে যায়নি। পাহাড়পুর কেবল পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি আমাদের বাঙালির অহংকার।

ইতিহাসের এই দীর্ঘ ভ্রমণে আমার সাথে থাকার জন্য সবাইকে অনেক ধন্যবাদ। পাহাড়পুর নিয়ে আপনার কোনো বিশেষ স্মৃতি বা তথ্য থাকলে কমেন্টে শেয়ার করতে ভুলবেন না।

আপনার একটি শেয়ার হয়তো আমাদের এই হারানো গৌরবকে আরও অনেকের কাছে পৌঁছে দেবে। দেখা হবে অন্য কোনো দিন, অন্য কোনো সোনালী গল্পের খোঁজে।

ভালো থাকবেন, আর ভালোবাসবেন আমাদের এই গর্বের বাংলাদেশকে।

Share This Article
Leave a Comment